‘নদী অধিকার মঞ্চ’র দক্ষিণ এশিয়া কমিটির দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলন ২০১৯ নেপালে অনুষ্ঠিত

ফারাক্কা বাধের কারণে শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই বাংলাদেশের পদ্মা নদী এখন পানিশূন্য হয়ে যায়। মরা নদীর বালুর স্তরে স্তরে আটকে আছে মাঝিদের নৌকাগুলো।কারণ ফারাকা এবং তিস্তা নদীর বুকে ভারতের বাধ নির্মাণ।

‘নদী অধিকার মঞ্চ’ দক্ষিণ এশিয়ার সমন্বয়ক জনাব ব্রিজরাজ কুশওয়াহা

ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে উজানে ভারতের অব্যাহত পানি প্রত্যাহারের পরিণতিতে এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মার এই করুণ দশা। অথচ সেই ফারাক্কা বাঁধের কারণে প্রতিবছর বন্যায় ডুবছে ভারতের বিস্তির্ণ অঞ্চল। সে কারণে নেপালের গান্ডাক নদীর দু’পাশেও দেখা দিচ্ছে বন্যা। ফলে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বিরুপ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল।

এ অবস্থায় পানিবন্টন চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন তিন দেশেরই নদী বিশেষজ্ঞরা। ক্ষতিগ্রস্থ এই তিনটি দেশের নদী কর্মীরা গত তিন বছর আগেই গঠন করেছেন ‘নদী অধিকার মঞ্চ’।

সংগঠনের দক্ষিণ এশিয়ার সমন্বয়ক জনাব ব্রিজরাজ কুশওয়াহা’র আহবানে নেপালের ডন্ডাক নদীর তীরে গত ২৬-২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত তিনদিন ব্যাপী দক্ষিণ এশিয়া কমিটির দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের উদ্বোধনী সভা অনুষ্ঠিত হয়।

পানিকে কেন্দ্রীক ত্রিদেশীয় সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নিতে নেপাল-বাংলাদেশ- ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং উত্তর প্রদেশের পানি অধিকার কর্মী ও প্রকৌশলী ও নদী কর্মীরা অভিন্ন নদীর পাপশে থাকার কথা বলেছেন।

সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন নেপালের পানি সম্পদ ও জ্বালানী মন্ত্রী বর্শমন পুন। ডি এন গুপ্তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান জেলা কর্মকর্তা, পুলিশ প্রধান, তদন্ত, মন্ত্রী, পৌরসভার প্রধান রাজনৈতিক দল এবং অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তিবাদিরা।

বাংলাদেশের পক্ষ বক্তব্য রাখেন নদী নিরাপত্তার সাম্জিক সংগঠন ‘নোঙর বংলাদেশ’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুমন শামস বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে নেপাল, বাংলাদেশ এবং ভারতও ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। নেপালের হিমালয় থেকে গন্ডাক নদীর মাধ্যমে পানি ভারতের গঙ্গায় আসে। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের কারণে ভরা মৌসুমে গন্ডাক নদী থেকে পানি আসতে পারছে না। ফলে ভারত ও নেপালে দেখা দিচ্ছে বন্যা। এর বিপরীতে পানিশূন্যতায় ভুগছে পদ্মা। ফলে এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা ও প্রকৃতিতে চরম বিরুপ প্রভাব পড়ছে। ওদিকে বন্যার কারণে ভারত ও নেপালে বহু সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। বন্যার সময় পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবে মারাও যাচ্ছেন অনেক মানুষ।

তিন দেশের সমাবেশে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের কাছ থেকে নদী কেন্দ্রীক যে সমস্যার কথা তিন দেশের সরকারকেই অবহিত করবে নদী অধিকার মঞ্চের ত্রিদেশীয় নদী কর্মীরা। ‘১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহে নৌ-চলাচল বহির্ভুত ব্যবহার সংক্রান্ত আইন’ বাস্তবায়নে তারা তিন দেশের সরকারকেই তাগাদা দেবেন। বিশেষ করে ফারাক্কা বাঁধ তোলার জন্য তারা দিল্লির কাছে দাবি জানাবেন।

শুধু ফারাক্কা নয়, কানপুরে গঙ্গা ব্যারাজ ও হরিদ্বারে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারে নির্মিত কৃত্রিম খালসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করেছে ভারত। ফারাক্কার উজানে উত্তর প্রদেশের কানপুরে গঙ্গার ওপর আরও একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া উত্তর প্রদেশ ও বিহারে সেচের জন্য প্রায় ৪০০ পয়েন্ট থেকে পানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব পয়েন্ট থেকে হাজার হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ কমে গেছে।

ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে শুষ্ক মৌসুম শুরুর আগেই পদ্মা পানিশূন্য হয়ে যাচ্ছে। পদ্মার এমন অবস্থার কারণে চর ও বরেন্দ্র এলাকায় বৈরী আবহাওয়া সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ১১০ ফুট নিচে অবস্থান করছে। দিনে দিনে তা আরও নিচের দিকেই যাচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলে হাজার হাজার গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে।

তিনি আরো বলেন, প্রতি বছর শুকনো মৌসুমের শুরুতেই পদ্মাজুড়ে চর পড়ে। সেই সঙ্গে পদ্মার শাখা-প্রশাখাসহ অন্তত ৩৬টি নদী কার্যত মরা খালে রূপ নিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই এ অবস্থা চলছে। এ অবস্থার জন্য তিনি ফারাক্কা বাঁধকেই দায়ী করেন। সেই সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী পদ্মায় পানির হিস্যাও দাবি করেন তিনি।

সম্মেলনের সঞ্চালক জনাব শৈলেন শর্মা বলেন, নেপাল ও ভারতের মধ্যে গন্ডাক চুক্তিতে যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল সেই চুক্তির মাধ্যমে নেপাল সরকার একটি ১৫ মেগাওয়াট হাইড্রো পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণ করা হয়ে ছিলো। ভারত সরকার ও তাদের কৃষকদের সেচের জন্য পানি পেয়েছিল।

কিন্তু এই চুক্তিটি কেবল লোক দেখানো চুক্তি পরে নদীর পানির অসম বন্টনের কারনে বর্ষায় প্রতি বছর নেপালের বিভিন্ন অঞ্চল বন্যায় ভেসে যায়। পাশাপাশি নেপালের গন্ডাক নদীর পানির সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বর্তমানে জলবিদ্যুৎ উত্পাদন হ্রাস পেয়েছে। গন্ডক নদীর উপর নির্মিত কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে উভয় পক্ষই হতাশাগ্রস্থ বলে মনে হয়।

সমঝোতা চুক্তিটি তিনটি মূল উদ্দেশ্য ১. সেচ ২. বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ও ৩. জলবিদ্যুৎকে কেন্দ্র করে। তবে নদীর উপর নদীর স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব উপেক্ষা করে এটি জনগণের কল্যাণকে উপেক্ষা করেছে। উভয় দেশের জন্য সমান স্বার্থের কথা বলা হয়েছিল, তবে চুক্তির শব্দগুলি কেবল কাগজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

যদিও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতীয় পক্ষ নেপালি জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করতে শুরু করেছিল এবং স্থানীয়রা নেপালি সরকারের কাছে আবেদন করেছিল, কিন্তু নেপালি সরকারও এ বলেছিল যে তারা গন্ডাক কমান্ড এলাকায় কাজ করতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *