২৩ মে হোক জাতীয় নৌ নিরাপত্তা দিবস : সুমন শামস

লঞ্চ দুর্ঘটনা : পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদীসহ নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রায় সব নদী বর্ষাকালে উত্তাল হয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে মনে জাগে নৌ দুর্ঘটনার ভয়। আমার ভয় আরেকটু বেশি। কারণ নৌ দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমার মায়ের মুখ। ২০০৪ সালের ২৩ মে মাদারীপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা ১৫৬টি তালি দেওয়া চলাচলের অযোগ্য লঞ্চ ‘এমভি লাইটিং সান’ ও ‘এমভি দিগন্ত’ মেঘনা নদীতে গভীর রাতে ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে গিয়েছিল। নদীতে সে রাতে কচুরিপানার মতো ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসেছিল দুই শতাধিক মৃতদেহ। সেদিনের একজন যাত্রী ছিলেন আমার প্রিয় মা। আর সেদিন থেকেই নৌ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা ‘নোঙর’ দাবি তুলে যাচ্ছি। ২০১১ সাল থেকে আমরা একই কর্মসূচির অংশ হিসেবে নদীতে ভাসমান আলোচনা সভার আয়োজন করে চলছি। আর ২০০৫ সাল থেকেই নানা কর্মসূচির মাধ্যমে যাত্রীদের

মধ্যে সচেতনতা ও কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তার জন্য কাজ করে চলছি। তারপরও কি এসেছে কাঙ্ক্ষিত

সচেতনতা ও সক্রিয়তা?

বস্তুত দক্ষিণবঙ্গের উপকূল, উত্তরের হাওর ও নদী-তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার অন্যতম মাধ্যম নদীপথ। একসময় দেশে নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় মিলে সর্বমোট প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ছিল। তার মধ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের নৌ-সওপ বিভাগ বাংলাদেশের উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ নৌপথে ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের সহায়তায় নদী জরিপ করে মোট ১৩ হাজার ৭৭০ কিলোমিটার নাব্য নৌপথকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপথ কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।

পরবর্তীকালে ক্রমান্বয়ে নদীতে পলিমাটি পড়ে নাব্য হ্রাস পেতে পেতে ১৯৮৮ সালে নৌপথ ৫ হাজার ৯৯৫ কিলোমিটারে এসে দাঁড়ায়। এই বিস্তৃত নৌপথে উপকূল, হাওর ও নদী-তীরবর্তী জেলাগুলোয় বসবাসরত দরিদ্র জনসাধারণ শিশু, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দৈনন্দিন প্রয়োজনে প্রতিদিনই পারাপার হচ্ছে এবং তাদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। নৌপথগুলোর ওপর যেমন মানুষের চাপ বাড়ছে, তেমনি ক্রমশ কমছে সরকারি সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা, দুর্বল নজরদারি, ব্যবস্থাপনা এবং যথাযথ আইন-কানুন প্রয়োগের অভাব রয়েছে, যে কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নদীতে ঘটে

গেছে অনেক নৌ দুর্ঘটনা; যা অনেকের জীবনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

স্বীকার করতে হবে, একযুগ আগে গড়ে ওঠা ‘নদী নিরাপত্তায় নিয়োজিত সামাজিক সংগঠন নোঙর’ নৌপথের যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে গণসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে। যার কারণে আমাদের গণমাধ্যম এবং সরকারের কাছে নৌপথের যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছুটা গুরুত্ব বেড়েছে। গত তিন বছর থেকে নদী ও হাওরাঞ্চলে যাত্রীবাহী ট্রলারডুবি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে তেমন কোনো লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটেনি।

আমরা মনে করি, এখন নৌপথ নিয়ে আরও মনোযোগী হওয়ার সময় এসেছে। বাংলাদেশে যাত্রীবাহী লঞ্চ-স্টিমার, সড়কপথে পারাপারের জন্য ফেরি, মালামাল-পণ্যবাহী কার্গো, যাত্রী ও পণ্যবাহী ইঞ্জিনচালিত ট্রলার, হস্তচালিত নৌকা ইত্যাদি নৌযান ব্যবহার করে মানুষ তাদের দৈনন্দিন যোগাযোগ ও পরিবহনের চাহিদা পূরণ করছে। এই যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থায় অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিন দ্বারা পরিচালিত নৌযানের রুট, নৌযান দুর্ঘটনা ইত্যাদি সম্পর্কে জানার সুযোগ হলেও এর বাইরে থাকা ছোট ছোট রুটের নৌযানগুলো আলোচনায় উঠে আসে না। এর কারণ হলো সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বৃহত্তর কাজের ক্ষেত্রটি আন্তরিকতার সঙ্গে নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং অভ্যন্তরীণ নৌ কর্তৃপক্ষ তাদের কাজের ক্ষেত্রটি প্রতিনিয়তই সংকুচিত করে আনছে। যেমন উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রেলওয়ে যাত্রী পারাপারের পথ হিসেবে ব্যবহূত বাহাদুরাবাদ-বালাসী নৌবন্দরের স্টিমার সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ সেখানে মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। বর্তমান রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে যাতায়াতকারী মানুষ ঝুঁকি নিয়ে নৌপথ পারাপার হচ্ছে এবং এই হার এখনও বেড়েই চলেছে।

উন্নত ও আধুনিক যাতায়াতের নামে নৌপথকে উপেক্ষার চোখে দেখে সড়কপথের প্রতি বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। এ জন্য অবশ্য নৌপথের লোকসানের বিষয়টি বারবার ফলাও করে প্রচার করা হলেও এর অন্তরালে রয়েছে পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতা, অবহেলা, দুর্নীতি ও অপেশাদারিত্ব।

নদীমাতৃক দেশের নদীপথে এ পর্যন্ত যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোসহ আগামী দিনের নৌ চলাচল নিরাপদ করতে বর্তমান সরকার বেশ আন্তরিকভাবে নৌপথের মনিটর করছে। বিগত সরকারের আমলেই মুষ্টিমেয় কয়েকটি রুটে সংঘটিত দুর্ঘটনা সরকার আমলে নিয়ে তদন্ত করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত দেশে ৫৩৫টি বড় ধরনের নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি। এসব দুর্ঘটনার পর সরকার দুর্ঘটনা তদন্তে এক বা একাধিক তদন্ত

কমিটি গঠন করেছে এবং কমিটিগুলো দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটে কিছু পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে প্রতিবেদনও দাখিল করেছে।

দেখা যাচ্ছে, ১৯৮৫ থেকে ২০০৯ সময়কালে উল্লেখযোগ্য নৌ দুর্ঘটনার সংগৃহীত সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে সর্বমোট ২৭৮টি সুপারিশ রয়েছে। যার অধিকাংশই প্রায় সব প্রতিবেদনেই বিদ্যমান। ফলে এটাই সত্য যে, প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কোনো চেষ্টাই হয়নি। এতে দিন দিন নৌ দুর্ঘটনার বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

নৌপথ নিয়ে বিভিন্ন অনুসন্ধানে তিনটি মূল ক্ষেত্রকে কারণ হিসেবে তুলে ধরা যায়। প্রথমত, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে চলাচলরত লঞ্চ মালিকরা সুকৌশলে নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রেখে উপর্যুপরি মুনাফা লাভে ২০০২ সাল থেকে মালিকরা লঞ্চ চালনায় নিয়ন্ত্রণসূচি বা রোটেশন পদ্ধতির সূচনা করেন। দ্বিতীয়ত, রোটেশন অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট দিনে শুধু একটি মালিকের লঞ্চ চলাচল করবে। ফলে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ও ভাড়া আদায়সাপেক্ষে মালিকরা একচেটিয়া লঞ্চ পরিচালনা করে থাকেন। এতে যাত্রীরা ভিন্ন লঞ্চের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কম ভাড়া নির্ণয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ছে এবং অনৈতিক বা চাপিয়ে দেওয়া নির্ধারিত ভাড়ায় যাতায়াত করতে যাত্রীরা বাধ্য হচ্ছে। তৃতীয়ত, কোনো দুর্ঘটনার পর শুধু পক্ষপাতদুষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করাই হয় না; তদন্ত কমিটিও অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। কারণ নৌ মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত স্থায়ী তদন্ত কমিটিতে কোনো নৌ প্রকৌশলী, পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ, নৌপরিবহন বিষয়ক গবেষক এবং মালিক ও যাত্রী প্রতিনিধি রাখা হয় না। চতুর্থত, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কাজের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সরঞ্জামাদি ও জনবল থাকে না।

এসব নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। আমরা প্রস্তাব করি, নৌ নিরাপত্তা নিয়ে সাংবৎসরিক তৎপরতার হিসাব-নিকাশ ও পরের বছরের পরিকল্পনার জন্য একটি নৌ নিরাপত্তা দিবস থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে ২৩ মে সেই মর্মান্তিক দিনটির চেয়ে উপযুক্ত দিবস আর কী হতে পারে?

স্বীকার করতেই হবে, নোঙরের দীর্ঘ এক যুগের সংগ্রামে আজ দেশব্যাপী মানুষ নদী নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবতে শুরু করেছে। কিন্তু এ ভাবনা বা আলোচনাই যথেষ্ট নয়। নদীমাতৃক দেশে নদীতে মানুষ ও সম্পদ বাঁচাতে জাতীয় একটি দিবসও ঘোষণা আজ সময়ের দাবি। এ বিষয়ে নোঙরের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে। আমরা তার সুদৃষ্টি কামনা করছি। সেই সঙ্গে দেশের সব মানুষকে এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণার আহ্বান জানাচ্ছি।

shumanshams@yahoo.com

সভাপতি, নদী নিরাপত্তার সামাজিক সংগঠন নোঙর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *