নদীকে জীবন্ত মানবিক সত্তার দাবিতে নোঙর এর ভাসমান সেমিনার

স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় স্লোগান ছিল পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা। কিন্তু স্বাধনীতার ৪৬ বছর পর সেসব ঠিকানা হারিয়ে যেতে বসেছে। তাতে জীবন যাপন, কৃষি চাষ, সবুজ প্রকৃতি, জলজ প্রাণী ও সার্বিক পরিবেশ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। তাই নদীকে ‘জীবন সত্তা’ ঘোষণার দাবিতে আজ সোমবার ভাসমান এক সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে বক্তব্য রেখেছেন নদী সংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট জনেরা। এই সেমিনারে তাদের বলা কথাগুলোর যে মূল ব্যক্তব্য উঠে এসেছে তা হলো নদীর স্বার্থ রক্ষা, নদী বেদখল ও দূষণমুক্ত রাখতে সম্ভাব্য করণীয় বিয়ষগুলো।

নিউজিল্যান্ডের মাওরি সম্প্রদায় হোয়াংগুই নদীর স্বীকৃতির জন্য দীর্ঘ ১৬০ বছর লড়াই করে অবশেষে গেল বছরের ১৬ মার্চ নিউজিল্যান্ড তাদের হোয়াংগুই নদীকে আইনগতভাবে জীবন্ত মানবিক সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর ঠিক চার দিন পর ভারতের আদালত গঙ্গা ও যমুনা নদীকে জীবন্ত মানবিক সত্তা ঘোষণা করেছেন। তখন থেকে এ নদী দুটো মানুষের মতো সমান অধিকার ও মর্যাদা পেয়েছে। এটা পৃথিবীতে দ্বিতীয় রায় যে নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই পদাঙ্ক অনুসারে নদীমাতৃক বাংলাদেশেও নদীকে জীবন্ত মানবিক সত্তার দাবি উঠে এসেছে ভাসমান এই সেমিনার থেকে। সেমিনার শেষে পাপেট শো এর মাধ্যমেও নদীকে জীবন সত্তা ঘোষণা করার অপরিহার্যতা তুলে ধরা হয়।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে এখনও কোনো নদী নীতিমালা নেই! ২০০৯ সালে নদনদী রক্ষায় হাইকোর্ট থেকে একটি রায় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাও ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়াও নদী রক্ষায় জাতীয় নদী কমিশন ও টাস্কফোর্স রয়েছে। এদের কোনো সুপারিশও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাই নদীও রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই যথা শিগগির নদী রক্ষা করাটা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। আর তা না হলে দখল-দূষণে মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা নদীগুলো তাদের অস্তিত্বের সংকটে পড়বে।

তাই নদীমাতৃক বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বহুমাত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে নোঙরের পক্ষে দেশের নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে। এটাকে আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নদীর অধিকার নদীকেই বুঝিয়ে দেওয়াটা জরুরী হয়ে পড়েছে। তাহলে প্রত্যেকটি নদী নিজেই বাদী হয়ে নিজেকে সুরক্ষার জন্য আদালতে রিট করতে পারবে, মামলা করতে পারবে।

এই দাবি পূরণের লক্ষ্যে নদী সংশ্লিষ্ট, সরকার ও দেশবাসীর কাছে নোঙরের চেয়ারম্যান সুমন সামনের আহ্বান, ‘’আসুন নদীর প্রতি আমরা সচেষ্ট হই, নদীগুলোকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করে নদীর প্রতি আমরা সদয় হই। তাহলে নদী আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে আর আমাদের দেশটি আরও সবুজ ও সুন্দর হয়ে উঠবে।’

সোমবার সকাল ১০টায় রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ভাসমান সভার জাহাজটি চাঁদপুরের উদ্দেশে ছাড়ে। সেখান থেকে নৌযানটি মুন্সগঞ্জ ভায়া হয়ে ঢাকায় ফেরে। ম্যারাথন ব্যাপি এই সেমিনারে তাদের নিজেদের ভাবনা তুলে ধরেন। তবে এই যাত্রায় সঙ্গী হতে না পারলেও ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহা পরিচালক (প্রশাসন) জনাব কবির বিন আনোয়ার। সেমিনারে প্রধান বক্তা ছিলেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমোডর এম মোজাম্মেল হক। সেমিনারের সভাপতিত্ব করেন নদী-নিরাপত্তা সংগঠনের আহ্ববায়ক সুমন শামস।

এছাড়া সেমিনারে অংশ হিউম্যান রাইটস্ এন্ড পীস ফর বাংলাদেশে এর সভাপতি এডভোকেট মনজিল মোরশেদ, ইসাবেলা ফাউন্ডেশন এর প্রধান উপদেষ্টা ও প্রকৃতি বিজ্ঞানীড. আনিসুজ্জামান খান, চ্যানেল আই এর নিউজ এডিটর মীর মাশরুর জামান, রিভারাইন পিপল এর মহাসচিব শেখ রোকন, শিক্ষক নুসরাত জাহান, বিআইডব্লিউ এর সাবেক প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ, পরিবেশ বিষয়ক জেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদুল ইসলাম, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ এর প্রতিনিধি জনাব শমসের আলী, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন এর আহবায়ক মিহির বাশ্বাস, গ্রীন বাংলা কোয়ালিশন এর আহবায়ক শামসুল মোমেন পলাশ, নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলন এর আহ্ববায়ক আমিনুর রসুল, এডভোকেট মাহবুবুর রাহমান, রোটারি ক্লাব অব আগারগাও এর সভাপতি আমিনুল ইসলাম তুহিনসহ অন্যরা।

অবশ্য নদীকে জীবন সত্তা ছাড়াও এই ভাসমান সভা থেকে মোট ৯টি দাবি উঠে এসেছে। সেগুলো হলো:

১. নদী সমূহকে-‘জীবন্ত সত্বা’ ঘোষণা করা।
২. ২৩ মে জাতীয় নৌ-নিরাত্তা দিবস ঘাষণা করা।
৩. ‘জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭’ অনুস্বাক্ষর করা।
৪. নদী ভাঙন রোধ করে নদী সিকস্তি মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
৫. আদি বুড়িগঙ্গা নদীসহ ঢাকার চারপাশের নদীপথ উদ্ধার করে নৌযান চালু করা।
৬. বেদখল হওয়া খাল, জলাশয় ও পুকুর উদ্ধার করা।
৭. নদীর প্লাবণভূমি চিহ্নিত করে বৃক্ষরোপণ করা।
৮. ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্প বাতিল করা।
৯. অভিন্ন নদীর পানির সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে দেশের সকল নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *