নদী বাঁচান-দেশ বাঁচান-মানুষ বাঁচান : নোঙর

ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ জানুয়ারি ২০১৯,(নোঙরনিউজ) : “নদী বাঁচান-দেশ বাঁচান-মানুষ বাঁচান” এই দাবিতে আজ ২৫ জানুয়ারি ২০১৯, শুক্রবার সকাল ১০:৩০ মিনিটে জাতীয় প্রেসক্লাব সড়কে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। নদী নিরাপত্তার সামাজিক সংগঠন নোঙর এই মানববন্ধের আয়োজন করে।

নোঙর সভাপতি সুমন শামস এক লিখিত প্রতিবেদনে বলেন, আমরা সারা দেশের নদীপ্রমিকরা নদীর কথা বলছি আজ থেকে অনেক দিন আগে থেকে। কারণ নদীমাতৃক দেশের নদীরা ভালো নেই আজ। বিপর্যয় নেমে এসেছে আমাদের বেশির ভাগ নদ-নদীতে। আমাদের অনুসন্ধান বলছে যে, তেরো শত নদীর দেশে এখন জীবিত আছে মাত্র ২৩০টি নদী। উজান দেশের উদাসীনতায় ভাটির দেশের পানি কমে যাওয়ায় আজ আমাদের নদীগুলোর এমন অবস্থা হয়েছে। দেশের ৪০টি নদীতে কমে গেছে পানি, ভয়াবহ পানি সঙ্কটের দিকে এগিয়ে চলছে নদীমাতৃক বাংলাদেশ!

দূযোর্গের মধ্যে এক শ্রেণির লোভি মানুষ পানি শূন্য নদীতে চলাচ্ছে দখলের উতসব। একই সাথে রাজধানীর বিভিন্ন নদী তীরবর্তী এলাকার কল-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য এবং দূষিত আবর্জনা ফেলার কাজ চলাচ্ছে এখনো। নদীতে দূষিত আর্বজনার কারণে দূষণের মাত্রা এতোই বেড়েছে যে, আদি বুড়িগঙ্গা, নড়াই নদী, বালুনদী, শীতলক্ষা নদীসহ তুরাগ নদীর বিভিন্ন এলাকায় নদীর জলে আগুন জ্বলে! আর এই নদীগুলোর দুই পাড়ের সকল বাসিন্দাদের রোগ ব্যধির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর হিসাব অনুযায়ি বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা এখন ৪০৫টি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ১০২টি, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ১১৫টি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী ৮৭টি, উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী ৬১টি, পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের নদী ১৬টি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী ২৪টি হিসেবে আলাদা করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

সুমন শামস আরো বলেন, পদ্মা নদীর শাখা প্রধান শাখা নদী গড়াই, আত্রাই, বড়াল নদী এখন পানির জন্য হাহাকার করছে। এই নদীর সাথে অন্যান্য শাখা নদী গুলোতেও পানির টান পড়তে শুরু করেছে। নদী নির্ভর সেচ কাজ ব্যাহত হয়ে পড়েছে। মাছ শুণ্য হয়ে গেছে বেশীর ভাগ নদ-নদী। এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশে এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়বেই।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে অসংখ্য নদনদীর মধ্যে অনেকগুলোই আকার এবং গুরুত্বে বিশাল। এসব নদীকে বড় নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।বৃহৎ নদী হিসেবে কয়েকটিকে উল্লেখ করা যায় এমন নদীসমূহ হচ্ছে: পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলি, শীতলক্ষ্যা, গোমতী ইত্যাদি।

বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী সুরমা। ৩৯৯ কিলোমিটার লম্বা। সবথেকে চওড়া যমুনা। দীর্ঘতম নদ ব্রহ্মপুত্র। বাংলাদেশের সব নদীর উৎপত্তি ভারত কিংবা তিব্বতে। একমাত্র সাংগু নদীর শুরু ও শেষ বাংলাদেশে। দেশের অর্থনীতিতে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। নদীর বয়ে আসা পলিমাটিতেই বাংলাদেশের কৃষিজমি অত্যন্ত উর্বর। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে নদীই ভরসা। পরিবহণের তিন-চতুর্থাংশ নদীপথে। জলপথ ৫ হাজার ৬৩২ কিলোমিটার। বর্ষায় বেড়ে হয় ৮ হাজার ৪৫ কিলোমিটার। সেচ আর বিদ্যুতের জন্যও নদীর দরকার। নদীর মাছ শুধু দেশের অর্থনীতির স্তম্ভ নয়, বৈদেশিক মুদ্রাও এনে দেয়।

শতসহস্র নদীর এই দেশে নদীগুলো কেমন আছে? এমন প্রশ্ন করা হলে, এক কথায় উত্তর পাওয়া যাবে- ভালো নেই। বর্তমানে দেশের নদ-নদীগুলো যৌবন হারিয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। যৌবনহারা এসব নদী বাঁচিয়ে রাখতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাও চোখে পড়ে না। এখনই নদীগুলোকে বাঁচানো না গেলে দেশকে একসময় বাঁচানো সম্ভব হবে না। কারণ নদীগুলো ঘিরেই গড়ে উঠেছিল দেশের প্রতিটি শহর, বন্দর ও হাটবাজার। এগুলো এখন শুধুমাত্র স্মৃতি।

এক সময় মালামাল পরিবহন ও যোগাযোগের সহজ উপায় ছিল নৌকা। এখন এই নৌকার দেখা মেলা ভার। সময়ের বিবর্তনে যেটুকু নদী পারাপারের বাহন রয়েছে তা দখল করেছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। জলবায়ু পরিবর্তন, দখল, দূষণসহ নানা কারণে নদনদীর অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে।

বিলুপ্তপ্রায় এসব নদী নিয়ে বিস্তর লেখা হলেও সমাধানের কোন সুনিদৃষ্ট পথ খুঁজে পাওয়া যায়নি। নদী নিয়ে সুনিদৃষ্টি কর্মপরিকল্পনা না থাকায় বছরের পর বছর ধরে আবহাওয়া ও জলবাযু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নদী স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। বৃষ্টিপাত কম হওয়া ও খরা মৌসুমে অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। এছাড়া ভারতের একতরফা নদী শাসনের ফলে নদনদী খাল বিল পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। গত সাড়ে চার দশকে দেশ থেকে হারিয়ে গেছে কয়েকশ নদী ও খেয়া ঘাট। এখনো শতাধিক নদী যৌবন হারিয়ে ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। দিনের পর দিন পলি পড়ে ভরাট হয়ে নাব্যতা ও গভীরতা হারাচ্ছে দেশের নদীগুলো।

প্রতি বছর দেশের নদ-নদীতে গড়ে জমা পড়ছে ৪ কোটি টন পলি। ফলে নৌপথ ছোট হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। গত ৪৮ বছরে নৌপথের দৈর্ঘ্য কমেছে ১৯ হাজার কিলোমিটার। স্বাধীনতার আগে দেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার, এখন তা কমে মাত্র ৫ হাজারেরও নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। খননের অভাবে পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাসহ অন্যান্য নদীগুলো এখন ধু-ধু বালুচর। এছাড়া দেশজুড়েই অব্যাহত রয়েছে নদী দখল ও দূষণ। ফলে কৃষি, জনস্বাস্থ্য, প্রাণি,উদ্ভিদ হুমকির মুখে পড়েছে।

অন্য দিকে নৌপথ তার গতীপথ হারিয়ে প্রায় এখনো ঘটছে ছোট-বড় লঞ্চ দূর্ঘটনা। গত ১৫ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখ দিবাগত গভীর রাতে মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদীতে একটি তেল বোঝাই কার্গোর সাথে ধাক্কা লেগে একটি ট্রলার ডুবে যায়৷ মাটি বোঝাই ওই ট্রলারটিতে ৩৪ জন শ্রমিক ছিলেন৷ তাঁদের মধ্যে ১৪ জন সাঁতরে তীরে উঠলেও বাকি ২০ জনের ১৮জনেরই এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি৷

গত ১৪ বছর ধরে নৌ নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন নোঙর-এর হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৫৩৫টি বড় নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে৷ এতে ৬ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে৷ এসব দুর্ঘটনা তদন্তে ৮শ ৬৩টি কমিটি গঠন করা হয়েছে৷ এই যে তদন্ত কমিটি হয়, তারা কোনোটিরই ফলাফল আমরা প্রকাশ হতে দেখি না৷ আর নৌপথের যানলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেমন কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হয় না৷

নিরাপত্তার সামাজিক সংগঠন নোঙর-এর সভাপতি সুমন শামস এর সভাপতিত্বে মানববন্ধনে অংশগ্রহন করেন বুড়িগঙ্গা বাচাও আন্দোলনের আহবায়ব জনাব মিহির বিশ্বাস, ওয়ার্কার বিডি’র নিবার্হী পরিচালক জনাব মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর জনি, কবি সৈয়দ এনায়েত আলী, বঙ্গজ’র সাধারণ সম্পাদক জনাব স্বজন সাহাসহ নোঙর পরিবারের সদস্য শাহ নেওয়াজ শাহীন, আমিনুল হক চৌধুরী, মাজেদুল হক, সরকার সজীব, পলাশ দাশ, রিয়াদ আরফানসহ বিভিন্ন নদীপ্রকৃতির সংগঠনের একাধিক প্রতিনিধিগণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *