নদী বাঁচান-দেশ বাঁচান-মানুষ বাঁচান : নোঙর

ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ জানুয়ারি ২০১৯,(নোঙরনিউজ) : “নদী বাঁচান-দেশ বাঁচান-মানুষ বাঁচান” এই দাবিতে আজ ২৫ জানুয়ারি ২০১৯, শুক্রবার সকাল ১০:৩০ মিনিটে জাতীয় প্রেসক্লাব সড়কে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। নদী নিরাপত্তার সামাজিক সংগঠন নোঙর এই মানববন্ধের আয়োজন করে।

নোঙর সভাপতি সুমন শামস এক লিখিত প্রতিবেদনে বলেন, আমরা সারা দেশের নদীপ্রমিকরা নদীর কথা বলছি আজ থেকে অনেক দিন আগে থেকে। কারণ নদীমাতৃক দেশের নদীরা ভালো নেই আজ। বিপর্যয় নেমে এসেছে আমাদের বেশির ভাগ নদ-নদীতে। আমাদের অনুসন্ধান বলছে যে, তেরো শত নদীর দেশে এখন জীবিত আছে মাত্র ২৩০টি নদী। উজান দেশের উদাসীনতায় ভাটির দেশের পানি কমে যাওয়ায় আজ আমাদের নদীগুলোর এমন অবস্থা হয়েছে। দেশের ৪০টি নদীতে কমে গেছে পানি, ভয়াবহ পানি সঙ্কটের দিকে এগিয়ে চলছে নদীমাতৃক বাংলাদেশ!

দূযোর্গের মধ্যে এক শ্রেণির লোভি মানুষ পানি শূন্য নদীতে চলাচ্ছে দখলের উতসব। একই সাথে রাজধানীর বিভিন্ন নদী তীরবর্তী এলাকার কল-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য এবং দূষিত আবর্জনা ফেলার কাজ চলাচ্ছে এখনো। নদীতে দূষিত আর্বজনার কারণে দূষণের মাত্রা এতোই বেড়েছে যে, আদি বুড়িগঙ্গা, নড়াই নদী, বালুনদী, শীতলক্ষা নদীসহ তুরাগ নদীর বিভিন্ন এলাকায় নদীর জলে আগুন জ্বলে! আর এই নদীগুলোর দুই পাড়ের সকল বাসিন্দাদের রোগ ব্যধির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর হিসাব অনুযায়ি বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা এখন ৪০৫টি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ১০২টি, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ১১৫টি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী ৮৭টি, উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী ৬১টি, পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের নদী ১৬টি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী ২৪টি হিসেবে আলাদা করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

সুমন শামস আরো বলেন, পদ্মা নদীর শাখা প্রধান শাখা নদী গড়াই, আত্রাই, বড়াল নদী এখন পানির জন্য হাহাকার করছে। এই নদীর সাথে অন্যান্য শাখা নদী গুলোতেও পানির টান পড়তে শুরু করেছে। নদী নির্ভর সেচ কাজ ব্যাহত হয়ে পড়েছে। মাছ শুণ্য হয়ে গেছে বেশীর ভাগ নদ-নদী। এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশে এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়বেই।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে অসংখ্য নদনদীর মধ্যে অনেকগুলোই আকার এবং গুরুত্বে বিশাল। এসব নদীকে বড় নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।বৃহৎ নদী হিসেবে কয়েকটিকে উল্লেখ করা যায় এমন নদীসমূহ হচ্ছে: পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলি, শীতলক্ষ্যা, গোমতী ইত্যাদি।

বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী সুরমা। ৩৯৯ কিলোমিটার লম্বা। সবথেকে চওড়া যমুনা। দীর্ঘতম নদ ব্রহ্মপুত্র। বাংলাদেশের সব নদীর উৎপত্তি ভারত কিংবা তিব্বতে। একমাত্র সাংগু নদীর শুরু ও শেষ বাংলাদেশে। দেশের অর্থনীতিতে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। নদীর বয়ে আসা পলিমাটিতেই বাংলাদেশের কৃষিজমি অত্যন্ত উর্বর। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে নদীই ভরসা। পরিবহণের তিন-চতুর্থাংশ নদীপথে। জলপথ ৫ হাজার ৬৩২ কিলোমিটার। বর্ষায় বেড়ে হয় ৮ হাজার ৪৫ কিলোমিটার। সেচ আর বিদ্যুতের জন্যও নদীর দরকার। নদীর মাছ শুধু দেশের অর্থনীতির স্তম্ভ নয়, বৈদেশিক মুদ্রাও এনে দেয়।

শতসহস্র নদীর এই দেশে নদীগুলো কেমন আছে? এমন প্রশ্ন করা হলে, এক কথায় উত্তর পাওয়া যাবে- ভালো নেই। বর্তমানে দেশের নদ-নদীগুলো যৌবন হারিয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। যৌবনহারা এসব নদী বাঁচিয়ে রাখতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাও চোখে পড়ে না। এখনই নদীগুলোকে বাঁচানো না গেলে দেশকে একসময় বাঁচানো সম্ভব হবে না। কারণ নদীগুলো ঘিরেই গড়ে উঠেছিল দেশের প্রতিটি শহর, বন্দর ও হাটবাজার। এগুলো এখন শুধুমাত্র স্মৃতি।

এক সময় মালামাল পরিবহন ও যোগাযোগের সহজ উপায় ছিল নৌকা। এখন এই নৌকার দেখা মেলা ভার। সময়ের বিবর্তনে যেটুকু নদী পারাপারের বাহন রয়েছে তা দখল করেছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। জলবায়ু পরিবর্তন, দখল, দূষণসহ নানা কারণে নদনদীর অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে।

বিলুপ্তপ্রায় এসব নদী নিয়ে বিস্তর লেখা হলেও সমাধানের কোন সুনিদৃষ্ট পথ খুঁজে পাওয়া যায়নি। নদী নিয়ে সুনিদৃষ্টি কর্মপরিকল্পনা না থাকায় বছরের পর বছর ধরে আবহাওয়া ও জলবাযু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নদী স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। বৃষ্টিপাত কম হওয়া ও খরা মৌসুমে অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। এছাড়া ভারতের একতরফা নদী শাসনের ফলে নদনদী খাল বিল পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। গত সাড়ে চার দশকে দেশ থেকে হারিয়ে গেছে কয়েকশ নদী ও খেয়া ঘাট। এখনো শতাধিক নদী যৌবন হারিয়ে ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। দিনের পর দিন পলি পড়ে ভরাট হয়ে নাব্যতা ও গভীরতা হারাচ্ছে দেশের নদীগুলো।

প্রতি বছর দেশের নদ-নদীতে গড়ে জমা পড়ছে ৪ কোটি টন পলি। ফলে নৌপথ ছোট হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। গত ৪৮ বছরে নৌপথের দৈর্ঘ্য কমেছে ১৯ হাজার কিলোমিটার। স্বাধীনতার আগে দেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার, এখন তা কমে মাত্র ৫ হাজারেরও নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। খননের অভাবে পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাসহ অন্যান্য নদীগুলো এখন ধু-ধু বালুচর। এছাড়া দেশজুড়েই অব্যাহত রয়েছে নদী দখল ও দূষণ। ফলে কৃষি, জনস্বাস্থ্য, প্রাণি,উদ্ভিদ হুমকির মুখে পড়েছে।

অন্য দিকে নৌপথ তার গতীপথ হারিয়ে প্রায় এখনো ঘটছে ছোট-বড় লঞ্চ দূর্ঘটনা। গত ১৫ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখ দিবাগত গভীর রাতে মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদীতে একটি তেল বোঝাই কার্গোর সাথে ধাক্কা লেগে একটি ট্রলার ডুবে যায়৷ মাটি বোঝাই ওই ট্রলারটিতে ৩৪ জন শ্রমিক ছিলেন৷ তাঁদের মধ্যে ১৪ জন সাঁতরে তীরে উঠলেও বাকি ২০ জনের ১৮জনেরই এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি৷

গত ১৪ বছর ধরে নৌ নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন নোঙর-এর হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৫৩৫টি বড় নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে৷ এতে ৬ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে৷ এসব দুর্ঘটনা তদন্তে ৮শ ৬৩টি কমিটি গঠন করা হয়েছে৷ এই যে তদন্ত কমিটি হয়, তারা কোনোটিরই ফলাফল আমরা প্রকাশ হতে দেখি না৷ আর নৌপথের যানলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেমন কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হয় না৷

নিরাপত্তার সামাজিক সংগঠন নোঙর-এর সভাপতি সুমন শামস এর সভাপতিত্বে মানববন্ধনে অংশগ্রহন করেন বুড়িগঙ্গা বাচাও আন্দোলনের আহবায়ব জনাব মিহির বিশ্বাস, ওয়ার্কার বিডি’র নিবার্হী পরিচালক জনাব মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর জনি, কবি সৈয়দ এনায়েত আলী, বঙ্গজ’র সাধারণ সম্পাদক জনাব স্বজন সাহাসহ নোঙর পরিবারের সদস্য শাহ নেওয়াজ শাহীন, আমিনুল হক চৌধুরী, মাজেদুল হক, সরকার সজীব, পলাশ দাশ, রিয়াদ আরফানসহ বিভিন্ন নদীপ্রকৃতির সংগঠনের একাধিক প্রতিনিধিগণ।

আদি বুড়িগঙ্গা নদীর ৩৫০ একর বেদখল : নদী রক্ষা জোট

৫ জুলাই ২০১৯, শুক্রবার, (নোঙরনিউজ) : আদী বুড়িগঙ্গা নদী পুণরুদ্ধারের দাবিতে আজ শুক্রবার, ৫ জুলাই ২০১৯ সকাল ১০:৩০ মিনিটে “নদী রক্ষা জোটের সদস্য ১৩টি নদী ও পরিবেশবাদি সংগঠনের অংশগ্রহণে আদি বুড়িগঙ্গা নদীর বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ কর্মসূচী পালন করে।

‘নদী রক্ষা জোট’ আহবায়ক ও ‘নোঙর’ সভাপতি, সুমন শামস মানববন্ধনে বক্তব্যের শুরুতে বলেন, “আদি বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে একাধিক সরকারী প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা গড়ে উঠেছে। বিশেষ কুড়ারঘাট, বুলুর ঘাটের ওপাড়ে নদীর জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে একটি সরকারি হাসপাতাল। তার পাশেই পশ্চিম রসুলপুরে নদীর বুকের উপড় গড়ে তোলা হয়েছে একটি সরকা্রী বিদ্যুৎ ষ্টেশন। এই ধরণের অসংখ্য সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে ঢাকার চার পাশের নদ-নদী দখল করে। এ সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের দখলের কারণে আদি বুড়িগঙ্গা নদী দখলে এগিয়ে মেতে উঠেছে নদীখেকো ভূমিদস্যুরা’।

নব্বুই দশকের পরেও আদি বুড়িগঙ্গা নদীতে জোয়ার-ভাটার প্রবাহ ছিলো। আদালতের আইন অমান্য করে এখনও দখলের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নদীখোকোরা। আদি চ্যানেলের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কোম্পানির নামে সাইনবোর্ড ঝুলছে।গত দুই যুগ ধরে চলতে থাকা আদি বুড়িগঙ্গা নদীর জায়গা দখলের কবলে পড়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, লালবাগ, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া রাজধানীর পশ্চিমের বুড়িগঙ্গার এই আদি চ্যানেলের প্রায় ৩৫০ একর বেদখল হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, সিটি কপোর্রেশনের সকল বর্জ্য, আবর্জ্যনা ভরাট কাজের বিষেশ সহযোগিতা করছে। যে কারণে মেটাডোর কোম্পানী, পান্না বেটারী, সিকাদার মেডিক্যেলেসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান আদী বুড়িগঙ্গা নদীর অস্তিত্ব বিলীন কর অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে।

আমরা চাই সেনা বাহিনীর সহযোগিতায় এ নদী দখলমুক্ত করে নদীটিকে ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার নৌপথের সাথে যুক্ত করে আদি বুড়িগঙ্গা নদীতে ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করা হোক। মিশে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলে রিকশার গ্যারেজ থেকে শুরু করে টেম্পুস্ট্যান্ড, অবৈধ মার্কেট, ট্রাকস্ট্যান্ড, বাড়িঘর, এমনকি মসজিদ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে। বছরের পর বছর এসব অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠলেও সেসব দখল প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো নির্বিকার ভূমিকা পালন করে চলেছে।

বুড়িগঙ্গা বাচাও আন্দোলনের আহবায়ক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মিহির বিশ্বাস বলেন, কামরাঙ্গীরচর ২ নম্বর পূর্ব রসুলপুর পাকা ব্রিজ ঘেঁষে বালুমাটি দিয়ে নদী ভরাট করে দোকানপাট গড়ে তোলা হয়েছে। এ ব্রিজের ১শ’ গজ দূরে নবাবগঞ্জ সেকশন ও কামরাঙ্গীরচর রনি মার্কেট সংযোগস্থলে নির্মিত পাকা ব্রিজ ঘেঁষে বিশাল অংশ দখল করে মার্কেট ও বসতঘর নির্মাণ করে ভাড়া হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। এ আদি চ্যানেলের বুকের ওপর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে বক্সকালভার্ট নির্মাণ করায় পশ্চিমের নদীর বুক দখলের মহোৎসব আবারও শুরু হয়েছে।

পরিবেশ আন্দোলন মঞ্চের সভাপতি আমির হাসান মাসুদ বলেন, মানব জাতীকে রক্ষা করার এবং প্রাণীকূলের অস্তিত্ব রক্ষা করতে আজকে আমাদের এই আয়োজন। আমাদের সকল প্রাণীকূলের খাদ্য উৎপাদনে আমাদের নদীগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। অথচ সেই নদীগুলো আজ দখল-দূষণের কারণে ফসল এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।সে কারণে আমাদের খাদ্যের সাথে মিশ্রিত বিশাক্ত ক্যামিক্যাল যুক্ত খাবার খেয়ে আমরা মৃত্যুর মুখে ধাবিত হচ্ছি।

রিভারাইন পিপলের পরিচালক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, নদী রক্ষা জোট থেকে আমরা দখল-দূষণে আক্রান্ত সকল নদী পুণরুদ্ধারের জন্য একতা বদ্ধ হয়েছি। আমরা দেখছি সরকারের মধ্যেই আদী বুড়িগঙ্গা নদীর দখল প্রসঙ্গে অনেক ভুল ধারণা এখনো কাজ করছে।তাই আজকে আমরা বৃটিশ আমলের ১৯১৩ সালের একটি ম্যাপ এবং ১৯৭১ সালের একটি ম্যাপ নিয়ে এসেছি।এই ম্যাপ অনুযায়ী আজকে আমাদের পর্যবেক্ষণ কর্মসূচী পালন করা হবে।

আমরা দেখবো যে, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের নদীটি কেমন ছিলো এবং বৃটিশ সময়ে এই নদীটি কেমন ছিলো। কোন কোন নদী দখল ও দূষণের কারণে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ এসব দেখে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে, নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্তৃপক্ষকে একটি প্রতিবেদন পেশ করে গণমাধ্যমে তা প্রকাশ করবো।

সচেতন নগরবাসীর আহবায়ক জনাব রুস্তুম খান বলেন, হাজারীবাগের সেকশন বেড়িবাঁধ সংলগ্ন শাখা নদীর দু’পাশে সেমিপাকা ঘর, দোকান, গ্যারেজ গড়ে তোলা হয়েছে। এসব দোকান থেকে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল দৈনিক এবং মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া আদায় করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব দখলের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছেন সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরও ভূমিকা রয়েছে। আমরা চাই এই নদী অবিলম্বে দখলমুক্ত করে নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দেয়া হোক।

তুরাগ নদী সুরক্ষা কমিটির সভাপতি, মোহাম্মদ আলী সমাবেশের সকলের সাথে নদী রক্ষার শপথ গ্রহণ করে বলেন, বর্ষা মৌসুমে বুড়িগঙ্গা নদীসৃষ্ট বন্যা থেকে নগরবাসীকে বাঁচাতে আশির দশকে তৎকালীন এরশাদ সরকার আবদুল্লাহপুর থেকে সোয়ারিঘাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে। এ বেড়িবাঁধ করার মূল লক্ষ্য ছিল রাজধানীকে বন্যামুক্ত করার পাশাপাশি বুড়িগঙ্গার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। সরকার ভালো উদ্দেশ্যে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলেও অবৈধ দখলদাররা বেড়িবাঁধকে কেন্দ্র করে দখলযজ্ঞ শুরু করেছে। তাই নদী সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনে আমরা জীবন দিতে প্রস্তত আছি।

পরিবেশ আন্দোলনের সহ-সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, এক সময় ভাবা হয়েছিল বুড়িগঙ্গাকে টিকিয়ে রাখার জন্য নদীর দুই পাড়ে এভাবে বেড়িবাঁধ নির্মাণ (ওয়ার্কওয়ে) করা হবে। আর নদীর বুক ঘিরে ফ্লাইওভার নির্মাণ করে রাজধানীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হবে। নদীর দখলদারদের চাপে পশ্চিমের শাখা নদী বেড়িবাঁধ ঘেঁষে নদীর বুকে সিটি কর্পোরেশনে আবর্জনা ফেলে দখল করা হচ্ছে। দখলের এ ধারাবাহিকতা এখনো চলমান আছে। নদী রক্ষা জোটের দাবি, ‘সিএস নকশা অনুযায়ী আদি বুড়িগঙ্গা নদীর দখল উচ্ছেদ করে দ্রুত সেনাবাহিনীর মাধ্যমে নদীকে খনন করে নৌ-যোগাযোগ চালু করতে হবে’।

“নদী রক্ষা জোটের” আহবায়ক ও নোঙর সভাপতি, সুমন শামস এর আহবানে কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করেন মিহির বিশ্বাস, আহবায়ক, বুড়িগঙ্গা বাচাও আন্দোলন এবং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন। মোহাম্মদ আমির হোসেন মাসুদ, পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি। মোহাম্মদ এজাজ, পরিচালক, রিভারাইন পিপল। মোহাম্মদ আলী, সভাপতি, তুরাগ নদী সুরক্ষা কমিটি। মোহাম্মদ রুস্তুম খান, আহবায়ক, সচেতন নগরবাসী।আমিনুল ইসলাম টুব্বুস, সভাপতি, বাংলাদেশ সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদ।

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর জনী, রাঙ্গাবালী কল্যণ পরিষদ। মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, মহানগন সমন্বয়ক, ঘাতক দালাল র্নিমূল কমিটি। তৌহিদুল ইসলাম মাতীন, সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব, বাংলাদেশ কিন্ডারর্গাডেন এডুকেশন সোসাইটি। আমিনুল হক চৌধুরী, সদস্য নোঙর। সৈয়দ শাহ নেওয়াজ শাহীন ও মো. নান্নু চৌধুরী, সদস্য নোঙর। মো. শাহজাহান, সম্মানিত সদস্য, নোঙর। মোহাম্মদ সবুজ, ঢাকা মহানগর সদস্য, নোঙর। বাবু, আহবায়ক, ঢাকার হালচাল।মো. রমজান দেওয়ান বাবু, নোঙর পরিবারের সম্মানিত সদস্য নান্নু চৌধুরী ও সরকার সজীব। মো. মাসুদুর রহমান শামীম, সদস্য, বুড়িগঙ্গা বাচাও আন্দোলন। মোহাম্মদ মাসুদ সদস্য, তুরাগ নদী সুরক্ষা কমিটি। মোহাম্মদ ফারুখ, সদস্য, পরিবেশ আন্দোলন মঞ্চ এবং জীবন আহসান, সদস্য, নোঙর কেন্দ্রীয় কমিটি।

নদীকে জীবন্ত মানবিক সত্তার দাবিতে নোঙর এর ভাসমান সেমিনার

স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় স্লোগান ছিল পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা। কিন্তু স্বাধনীতার ৪৬ বছর পর সেসব ঠিকানা হারিয়ে যেতে বসেছে। তাতে জীবন যাপন, কৃষি চাষ, সবুজ প্রকৃতি, জলজ প্রাণী ও সার্বিক পরিবেশ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। তাই নদীকে ‘জীবন সত্তা’ ঘোষণার দাবিতে আজ সোমবার ভাসমান এক সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে বক্তব্য রেখেছেন নদী সংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট জনেরা। এই সেমিনারে তাদের বলা কথাগুলোর যে মূল ব্যক্তব্য উঠে এসেছে তা হলো নদীর স্বার্থ রক্ষা, নদী বেদখল ও দূষণমুক্ত রাখতে সম্ভাব্য করণীয় বিয়ষগুলো।

নিউজিল্যান্ডের মাওরি সম্প্রদায় হোয়াংগুই নদীর স্বীকৃতির জন্য দীর্ঘ ১৬০ বছর লড়াই করে অবশেষে গেল বছরের ১৬ মার্চ নিউজিল্যান্ড তাদের হোয়াংগুই নদীকে আইনগতভাবে জীবন্ত মানবিক সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর ঠিক চার দিন পর ভারতের আদালত গঙ্গা ও যমুনা নদীকে জীবন্ত মানবিক সত্তা ঘোষণা করেছেন। তখন থেকে এ নদী দুটো মানুষের মতো সমান অধিকার ও মর্যাদা পেয়েছে। এটা পৃথিবীতে দ্বিতীয় রায় যে নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই পদাঙ্ক অনুসারে নদীমাতৃক বাংলাদেশেও নদীকে জীবন্ত মানবিক সত্তার দাবি উঠে এসেছে ভাসমান এই সেমিনার থেকে। সেমিনার শেষে পাপেট শো এর মাধ্যমেও নদীকে জীবন সত্তা ঘোষণা করার অপরিহার্যতা তুলে ধরা হয়।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে এখনও কোনো নদী নীতিমালা নেই! ২০০৯ সালে নদনদী রক্ষায় হাইকোর্ট থেকে একটি রায় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাও ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়াও নদী রক্ষায় জাতীয় নদী কমিশন ও টাস্কফোর্স রয়েছে। এদের কোনো সুপারিশও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাই নদীও রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই যথা শিগগির নদী রক্ষা করাটা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। আর তা না হলে দখল-দূষণে মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা নদীগুলো তাদের অস্তিত্বের সংকটে পড়বে।

তাই নদীমাতৃক বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বহুমাত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে নোঙরের পক্ষে দেশের নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে। এটাকে আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নদীর অধিকার নদীকেই বুঝিয়ে দেওয়াটা জরুরী হয়ে পড়েছে। তাহলে প্রত্যেকটি নদী নিজেই বাদী হয়ে নিজেকে সুরক্ষার জন্য আদালতে রিট করতে পারবে, মামলা করতে পারবে।

এই দাবি পূরণের লক্ষ্যে নদী সংশ্লিষ্ট, সরকার ও দেশবাসীর কাছে নোঙরের চেয়ারম্যান সুমন সামনের আহ্বান, ‘’আসুন নদীর প্রতি আমরা সচেষ্ট হই, নদীগুলোকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করে নদীর প্রতি আমরা সদয় হই। তাহলে নদী আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে আর আমাদের দেশটি আরও সবুজ ও সুন্দর হয়ে উঠবে।’

সোমবার সকাল ১০টায় রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ভাসমান সভার জাহাজটি চাঁদপুরের উদ্দেশে ছাড়ে। সেখান থেকে নৌযানটি মুন্সগঞ্জ ভায়া হয়ে ঢাকায় ফেরে। ম্যারাথন ব্যাপি এই সেমিনারে তাদের নিজেদের ভাবনা তুলে ধরেন। তবে এই যাত্রায় সঙ্গী হতে না পারলেও ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহা পরিচালক (প্রশাসন) জনাব কবির বিন আনোয়ার। সেমিনারে প্রধান বক্তা ছিলেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমোডর এম মোজাম্মেল হক। সেমিনারের সভাপতিত্ব করেন নদী-নিরাপত্তা সংগঠনের আহ্ববায়ক সুমন শামস।

এছাড়া সেমিনারে অংশ হিউম্যান রাইটস্ এন্ড পীস ফর বাংলাদেশে এর সভাপতি এডভোকেট মনজিল মোরশেদ, ইসাবেলা ফাউন্ডেশন এর প্রধান উপদেষ্টা ও প্রকৃতি বিজ্ঞানীড. আনিসুজ্জামান খান, চ্যানেল আই এর নিউজ এডিটর মীর মাশরুর জামান, রিভারাইন পিপল এর মহাসচিব শেখ রোকন, শিক্ষক নুসরাত জাহান, বিআইডব্লিউ এর সাবেক প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ, পরিবেশ বিষয়ক জেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদুল ইসলাম, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ এর প্রতিনিধি জনাব শমসের আলী, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন এর আহবায়ক মিহির বাশ্বাস, গ্রীন বাংলা কোয়ালিশন এর আহবায়ক শামসুল মোমেন পলাশ, নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলন এর আহ্ববায়ক আমিনুর রসুল, এডভোকেট মাহবুবুর রাহমান, রোটারি ক্লাব অব আগারগাও এর সভাপতি আমিনুল ইসলাম তুহিনসহ অন্যরা।

অবশ্য নদীকে জীবন সত্তা ছাড়াও এই ভাসমান সভা থেকে মোট ৯টি দাবি উঠে এসেছে। সেগুলো হলো:

১. নদী সমূহকে-‘জীবন্ত সত্বা’ ঘোষণা করা।
২. ২৩ মে জাতীয় নৌ-নিরাত্তা দিবস ঘাষণা করা।
৩. ‘জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭’ অনুস্বাক্ষর করা।
৪. নদী ভাঙন রোধ করে নদী সিকস্তি মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
৫. আদি বুড়িগঙ্গা নদীসহ ঢাকার চারপাশের নদীপথ উদ্ধার করে নৌযান চালু করা।
৬. বেদখল হওয়া খাল, জলাশয় ও পুকুর উদ্ধার করা।
৭. নদীর প্লাবণভূমি চিহ্নিত করে বৃক্ষরোপণ করা।
৮. ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্প বাতিল করা।
৯. অভিন্ন নদীর পানির সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে দেশের সকল নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা।